hasina

ভোটের সংকট: দায় কার? নির্বাচন কমিশন নাকি দলের?

3

বাংলাদেশে মঙ্গলবার দুইশো’র বেশি এলাকায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কম কম ছিল বলে খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে যে অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ভোটে প্রায় একই ধরণের প্রবণতা দেখা গেছে।

পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মাঝে চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং সেজন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ভোটাররা কেন্দ্রমুখী হচ্ছে না। তারা নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির বিরুদ্ধেও ব্যর্থতার অভিযোগ করেছেন।

দুই দল আবার একে অপরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

দক্ষিণ পশ্চিমে খুলনার পাইকগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধীদল বিএনপির প্রার্থী ছিল। দুই প্রার্থীর সমর্থকদের অংশ গ্রহণে নির্বাচনী প্রচারণাও জমেছিল।

কিন্তু ভোটের দিনে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।

সেখানকার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে স্থানীয় একজন সাংবাদিক মো: আবু তৈয়ব বলছেন, “পাইকগাছার উপজেলা নির্বাচনে সকাল ১২টা পর্যন্ত ১৫টা কেন্দ্রে দেখেছিলাম, যে কেন্দ্রে ৩,০০০ ভোট, সেখানে ভোট পড়েছে ১৯ বা ২০টা। আমি অতীতেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন কাভার করেছি। তখন একটা গমগম পরিবেশ বা উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল। এখনকার পরিবেশ একেবারে আলাদা। ভোটকেন্দ্রগুলো খাঁ খাঁ করছে।”

পাইকগাছায় ভোটের যা চিত্র ছিল, একই ধরণের খবর পাওয়া গেছে আরও সাতটি উপজেলা পরিষদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ব্যাপারে।

আর ১৯২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থীদের চেষ্টায় ভোটার উপস্থিতি ছিল। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে এই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রার্থী থাকলেও সাধারণত ভোটারদের যে ব্যাপক অংশ গ্রহণ থাকে, তার তুলনায় এখন ভোটার উপস্থিতি অনেক কম ছিল। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

 

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী একটি বেসরকারি সংস্থা ব্রতী’র শারমিন মুরশিদ বলেছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে, সেজন্য ভোটারদের কাছে এখন কোন নির্বাচন নিয়েই আগ্রহ নেই।

“নির্বাচনী যে ব্যবস্থা বা সুশাসনের যে ব্যবস্থা- এটা কিন্তু ধসে গেছে। নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনার অধীনে যে নির্বাচন হচ্ছে, তার প্রতি মানুষের আর এক বিন্দু আস্থা নেই। কারণ বিগত নির্বাচনগুলোতে মানুষ ভোট দিতে গিয়ে ভোট দিতে পারেনি। তো মানুষের ভেতরে এই বোধটা কাজ করছে যে আমি ভোট দিতে যাব কিসের জন্য-আমাকেতো ভোট দিতে দেয়া হবে না। এই আস্থাহীনতা বড় বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ঢাকার দু’টি সিটি করপোরেন নির্বাচনে ৩০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছিল।

সর্বশেষ গত শনিবার জাতীয় সংসদের ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়েছিল ১০.৪৩%।

বিভিন্ন নির্বাচনে এই ভোটকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক অনেক কম বলে উল্লেখ করেছেন নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা।

তারা বলেছেন, মানুষের আস্থার সংকট এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, এর দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায় বলে তারা মনে করেন।

তবে এমন বক্তব্য মানতে রাজি নন একজন নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম।

তিনি বলেছেন, “আমি মনে করিনা যে শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাহীনতার কারণে ভোটাররা আসছেন না। কারণ নির্বাচন কমিশনতো এটুকুই করবে যে ভোটাররা যাতে ভোট দিতে আসতে পারেন, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশন সেটা করছে। আমি বলবো, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে আর যারা আছেন, যেমন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং ভোটার-তাদেরও সক্রয়ি সহযোগিতা প্রয়োজন।”

নির্বাচন কমিশন যেমন রাজনেতিক দলগুলোর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

পর্যবেক্ষকরাও বলেছেন, এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও দলীয়ভিত্তিতে হয়। সেগুলো থেকেও ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকি প্রধান দুই দলের সমর্থকদেরও ভোট নিয়ে আগ্রহ কমেছে। পর্যবেক্ষকরা বিভিন্ন নির্বাচনে এমন চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

সেখানে দলগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যর্থতার অভিযোগ করছেন পর্যবেক্ষকরা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

তবে বিরোধীদল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিস্থিতির দায় চাপিয়েছেন সরকার এবং আওয়ামী লীগের ওপর।

“পুরোপুরি কর্তৃত্ববাদী সরকার যখন থাকে, এবং সেটা যখন একটা দলকেই প্রমোট করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, তখন নির্বাচনী ব্যবস্থা শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য একটা টুল হিসাবে ব্যবহৃত হয়।এটা মানুষ কয়েকটা নির্বাচনের মাদ্যমে টের পেয়ে গেছে। ফলে আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে।”

মি: আলমগীর আরও বলেছেন, “এতকিছুর পরও আমরা কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। তাতে কি ঘটছে- এখনতো আমাদের জবাবদিহি করতে হয় আমাদের দলের নেতাকর্মীদের কাছে যে কেন এই নির্বাচনে আমরা যাচ্ছি?”

মাহবুবুল আলম হানিফ
মাহবুবুল আলম হানিফ

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে রাজনৈতিক চিন্তা থেকে বিএনপি নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

“বিএনপি শুরু থেকেই নির্বাচনগুলোতে অংশ নিচ্ছে মূলত নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যে। আর তাই তারা তাদের ভোটারদেরও ম্যাসেজ দিচ্ছে যে ভোট দেয়ার প্রয়োজন নেই। সেখানে শুধু আমাদের আওয়ামী লীগের যারা প্রার্থী হচ্ছে, তাদের পক্ষের ভোটাররা ভোট দিতে যাচ্ছে। যখন আওয়ামী লীগের ভোটাররাও দেখছে, মাঠে শক্ত প্রতিপক্ষ বা বিএনপি প্রার্থীর তৎপরতা নেই। তখন আমাদের ভোটারদেরও আগ্রহ কিছুটা কমে যায়।”

এমন পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষকদের অনেকে বলেছেন, ভোটারদের আস্থার সংকট বা ধসে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে কবে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে, সেটা তাদের জানা নেই।

সূত্র: বিবিসি