মিয়ানমারের ব্যবসা খাতে বিপর্যয়ের ছায়া

মিয়ানমারে চলতি মাসের শুরুতে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়া এরই মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নাগরিকরা সামরিক জান্তার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ অভ্যুত্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটির রাজনৈতিক মেরুদণ্ডকে দুর্বল তো করেছেই, পাশাপাশি ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে এর অর্থনীতিকে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জাপান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের কোম্পানি এখন মিয়ানমার থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে। খবর ব্লুমবার্গ।

এমনিতেই কভিড-১৯ মহামারীর কারণে চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের ব্যবসা খাত। এর ওপর বিদেশী বিনিয়োগ চলে গেলে রীতিমতো খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াবে দেশটির অর্থনীতি।

বিয়ার উৎপাদনকারী কিরিন হোল্ডিংস কোম্পানি, গেমিং কোম্পানি রেজার ইনকরপোরেশনসহ বিভিন্ন কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীর চোখ এখন মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে। অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর এই ক্যুর কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তা সতর্ক পর্যবেক্ষণে রেখেছে তারা।

মিয়ানমারে বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল থাইল্যান্ডের সর্ববৃহৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপারের। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে তারা তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত করেছে।

একটা সময় ছিল, যখন জ্বালানি তেল ও গ্যাস থেকে শুরু করে অবকাশ কেন্দ্র—সব খাতেই বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি ছিল মিয়ানমার। কিন্তু পরিস্থিতি এখন পাল্টেছে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয়া সামরিক সরকারের ওপর এখন ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। মিয়ানমারের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এমনটি হলে মিয়ানমারের ব্যবসা খাতে ঘোর অন্ধকার নেমে আসবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে প্রায় ৫৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ হারাতে হবে দেশটিকে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইউনাইটেড ফার্স্ট পার্টনার্সের এশিয়ান রিসার্চের প্রধান জস্টিন ট্যাং বলেছেন, ‘নিশ্চিতভাবেই মিয়ানমারের অর্থনীতির ওপর এই সামরিক অভ্যুত্থানের বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ এতদিন যেসব বিদেশী করপোরেট প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগ করেছে, তাদের অবস্থা এখন অনেকটা এমন—আগে মিয়ানমার ত্যাগ করা, তারপর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।’

গত বছরের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ টাওয়ার কোম্পানিকে কিনে নিতে একটি চুক্তি করে সিভিসি ক্যাপিটাল পার্টনার। চুক্তিটির আকার ছিল ৭০ কোটি ডলার। ইরাওয়াডি গ্রিন টাওয়ারস লিমিটেড অধিগ্রহণের এ চুক্তি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগ। এর আগে রয়েছে থাই বেভারেজ কর্তৃক মিয়ানমার ডিস্টিলারি গ্রুপ অধিগ্রহণ চুক্তি।

মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক বিনিয়োগ অংশীদার হলো সিঙ্গাপুর। এখন পর্যন্ত দেশটিতে অনুমোদিত মোট বিদেশী বিনিয়োগের ৩৪ শতাংশই এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। সেখানকার তালিকাভুক্ত কনগ্লোমারেট ইওমা স্ট্র্যাটেজিং হোল্ডিংস লিমিটেডের বলতে গেলে পুরো রাজস্বই আসে মিয়ানমার থেকে। সেই সিঙ্গাপুর এখন পাখির চোখে মিয়ানমারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর সেনাবাহিনীর এই নগ্ন হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ জানাতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে বয়কটের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটিতে ১৩৪টির মতো কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো সামরিক জান্তা পরিচালিত দুটি হোল্ডিং কোম্পানির মালিকানাধীন।

মালয়েশিয়ার মালয়ান ব্যাংকিং বারহাদ ধারণা করছে, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি অর্থবছরে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর আগের পূর্বাভাসে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল।