উচ্চ ঝুঁকিতে কয়েক লাখ পরিবহন শ্রমিক

6

ভিড়-ভাট্টা তাদের নিত্যসঙ্গী। নেই মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার সুযোগ। পেশার প্রয়োজনেই ছুটতে হয় অবিরাম। আজ এখানে তো কাল ওখানে! সারা দিন যে গাড়িতে শত শত মানুষ চড়ে, সে গাড়িতেই রাতে ঘুমান পরিবহন শ্রমিকরা। খেতে হয় হোটেল-রেস্তোরাঁয়। পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধাও নেই। এমন বোহেমিয়ান জীবনযাপনের কারণেই প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশের পরিবহন শ্রমিকরা। তাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি।

ঢাকার গাবতলী-মতিঝিল রুটের একটি বাসে সহকারীর কাজ করেন মকবুল মিয়া। সারা দিন কাজ করে রাতে বাসেই ঘুমান তিনি। সম্প্রতি দেশজুড়ে করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর মাস্ক ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে হাত ধোয়ার খুব একটা সুযোগ পান না বলে জানিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের হিসাবে দেশে পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। নিম্ন আয়ের এ পরিবহন শ্রমিকরা করোনাভাইরাসের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে মনে করছেন পরিবহন মালিকরাও। তারা জানিয়েছেন, চালকদের প্রতিনিয়ত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটতে হয়। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রয়োজনে চলে যেতে হয় সীমান্ত এলাকায়। সাধারণ মানুষ চাইলেই ঘরে বা সীমিত পরিসরে চলাফেরা করতে পারেন। এ সুযোগটা কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা পান না। ফলে তাদের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।

সংক্রমণের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ারও বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পরিবহন শ্রমিকরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসেন। তাই তাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি দ্রুত অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তুতি হিসেবে পরিবহন শ্রমিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

পরিবহন শ্রমিকদের এবং তাদের মাধ্যমে অন্যের মধ্যে করোনার সংক্রমণ রোধে গণপরিবহন বন্ধ রাখার কথাও বলছেন কেউ কেউ। ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা হুমায়ন কবির মনে করেন, বাংলাদেশে গণপরিবহনে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। একদিকে মানুষের ভিড়, অন্যদিকে এগুলোর নোংরা পরিবেশ করোনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন অবস্থায় আগামী দুই সপ্তাহ গণপরিবহন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

মাদারীপুরের শিবচর ছাড়া দেশের অন্য কোথাও গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণা আসেনি। সরকারের কাছ থেকে নির্দেশনা না পেলে গণপরিবহন বা পরিবহন বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। করোনাভাইরাসের কারণে স্বল্প বা দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি উল্লেখ করে বাংলাদেশ বাস ট্রাক-মালিক সমিতির সভাপতি ও শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমেশ চন্দ্র ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সারা দেশে বাস বন্ধ হবে কিনা, এ সিদ্ধান্ত দেবে সরকার। সরকারের কাছ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক তাজুল ইসলাম বলছেন, ভাইরাসটির কারণে এমনিতেই পণবাহী গাড়ির ট্রিপের সংখ্যা কমে গেছে। অনেক চালক গাড়ি চালাতে চাইছেন না। পরিবহন শ্রমিকদেরও আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে গাড়ি বন্ধের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, তা মেনে নেয়ার কথা জানান তিনি।

করোনার ঝুঁকিতে আছেন নৌযান শ্রমিকরাও। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ছয়টি জেলার ৩৮টি রুটে দেড়শর বেশি লঞ্চ চলাচল করে। প্রতিদিন কয়েক লাখ যাত্রী পরিবহন হয় এসব লঞ্চে। বেশির ভাগ লঞ্চই থাকে যাত্রীতে ঠাসা। প্রতিদিন এসব যাত্রীর সংস্পর্শে আসেন কয়েক হাজার নৌযান শ্রমিক। ফলে করোনায় আক্রান্ত ও ছড়িয়ে দেয়ার উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন তারা।