দেশে ভোজ্যতেল বাজারের আদ্যোপান্ত

8

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে বছরে ৩০ লাখ টন তেল ও চর্বি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ভোজ্য ও অভোজ্য দুই ধরনের তেল ও চর্বি রয়েছে। অয়েল ওয়ার্ল্ড ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে তেল ও চর্বির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে তা সবচেয়ে বেশি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে তেল ও চর্বির মোট ব্যবহার ছিল ৩০ লাখ ৪০ হাজার টন, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে দেশে ২৯ লাখ ৫০ হাজার টন তেল ও চর্বি ব্যবহার হয়েছিল। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭০ হাজার টন।

এ প্রবৃদ্ধির জের ধরে তেল ও চর্বির মাথাপিছু বার্ষিক গড় ব্যবহার ১৮ দশমিক ৪ কেজি থেকে বেড়ে গত বছর ১৮ দশমিক ৭ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ২০১২ সালেও এর পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৪ কেজি। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ও সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা যায়।

বছর বছর দেশে ভোজ্যতেলের ব্যবহার বাড়লেও উৎপাদন সে তুলনায় বাড়ানো যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের বাজারে প্রধানত তিন ধরনের ভোজ্যতেল আমদানি হয়। পাম অয়েল, সয়াবিন ও ক্যানোলা বা সরিষা তেল। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানির ক্ষেত্রে এ তিন ধরনের ভোজ্যতেলের আনুপাতিক হার ছিল যথাক্রমে ৫৮:৩৭:৫।

ব্যবহার ও আমদানির ক্ষেত্রে ২০০৩ সাল থেকে দেশের বাজারে পাম অয়েল প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তিন ধরনের ভোজ্যতেলের মধ্যে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত আকারে আমদানি হয়। অপরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা ভোজ্যতেল স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের পর বাজারজাত করা হয়।

অন্যদিকে কয়েক বছরে দেশে পশুখাদ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সয়াবিন বীজের আমদানি ক্রমেই বাড়তির দিকে রয়েছে। আমদানি করা সয়াবিন বীজ মাড়াই করে ১৮-২০ শতাংশ অপরিশোধিত সয়াবিন তেল পাওয়া যায়, যা স্থানীয়ভাবে পরিশোধন করে বাজারজাত করা হয়। আর সরিষা বীজ আকারে আমদানি হয় এবং স্থানীয়ভাবে মাড়াই করে প্রাপ্ত তেল বাজারজাত করা হয়। অপরিশোধিত সরিষা তেলের ঝাঁজ ও লালচে হলুদ রঙ ভোক্তারা পছন্দ করেন।

লক্ষণীয়, যখন দেশে তেল ও চর্বির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে, ঠিক তখনই দেশের দুটি প্রধান ভোজ্যতেল পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের আমদানি গত বছর ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমে এসেছে। গত বছর অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি কমেছে ৪ শতাংশ ও পাম অয়েল আমদানি কমেছে ৯ শতাংশ। অথচ এ দুটি ভোজ্যতেল দেশের চাহিদার ৮৫-৯০ শতাংশ পূরণ করে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এ ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হচ্ছে? উত্তরটাও সোজা। এ দুই প্রকার ভোজ্যতেলের চাহিদা ও আমদানিতে বাড়তি অংশটুকু আমদানি করা তেলবীজ ভাঙিয়ে পূরণ করা হয়। অর্থাৎ আমরা অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি কমিয়ে তেলবীজ আমদানি বাড়াচ্ছি।

অয়েল ওয়ার্ল্ডের তথ্য বলছে, গত বছর দেশে অপরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ২০ হাজার টন। অন্যদিকে গত বছর দেশে মোট ৮ লাখ ৪০ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে। এর আগের বছর পণ্যটির আমদানির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার টন।

এর বিপরীতে ২০১৯ সালে দেশে ১৫ লাখ ৯০ হাজার টন সয়াবিন তেলবীজ আমদানি হয়েছে। ২০১৮ সালে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন সয়াবিন তেলবীজ আমদানি হয়েছিল। ২০১৮ সালে দেশে ৪ লাখ ৩০ হাজার টন সরিষা তেলবীজ আমদানি হয়েছিল। গত বছর এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার টনে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউয়ে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভোজ্যতেল আমদানিতে বাংলাদেশ সব মিলিয়ে ১১৬ কোটি ১০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৮৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তেলবীজ আমদানিতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪০ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৫৭ কোটি ১০ লাখ ডলার।

দেশের বাজারে সয়াবিন থেকে উৎপাদিত পশুখাদ্যের বর্ধিত চাহিদার কারণে গত বছরগুলোয় কয়েকটি সয়াবিন মাড়াই কারখানা গড়ে উঠেছে। সয়াবিন থেকে উৎপাদিত উপাদান সয়ামিল পোলট্রি ও পশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহূত হয়। সয়াবিন মাড়াই কারখানাগুলো স্থানীয় পোলট্রি, পশু ও মত্স্য খামারের খাদ্য উপাদান সরবরাহ ছাড়াও স্থানীয় বাজারে তূলনামূলক কম দামে সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে।

আমদানি করা অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের জন্য ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট দিতে হয়। তবে আমদানি করা সয়াবিন স্থানীয়ভাবে মাড়াই করে উৎপাদিত তেলের ওপর ভ্যাট নেই। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সয়াবিন তেল আমদানি করা অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের চেয়ে সস্তা। এ আর্থিক লাভের কারণে উৎসাহিত হয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সয়াবিন মাড়াই কারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ধারণা করা যায়, দেশের সয়াবিন মাড়াইয়ের সক্ষমতা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হবে। একই সঙ্গে বাড়বে সয়াবিন তেলবীজ আমদানি। ফলে দেশেই ভোজ্যতেল উৎপাদনে (বিশেষত সয়াবিন তেল) আমরা ধীরে ধীরে সক্ষম হয়ে উঠব।

একেএম ফখরুল আলম

রিজিওনাল ম্যানেজার (বাংলাদেশ ও নেপাল)

মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কাউন্সিল (এমপিওসি)