শুধু মালিক নয় সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হোক শ্রমিকও

8

দেশের শিল্প-কারখানাগুলোর প্রায় ৬০ লাখ শ্রমিকের কর্মজীবন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে চলমান কভিড-১৯ পরিস্থিতি। চলমান অর্থনৈতিক ধসে এসব শ্রমিকের কর্ম হারানোর ঝুঁকি তৈরির পাশাপাশি তাদের জীবনযাপনের উপায় নিয়েই তৈরি করছে বড় ধরনের শঙ্কা। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে গেলে সরকারকে যদি লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, সেক্ষেত্রে অর্থনীতিতে নভেল করোনাভাইরাসের মারাত্মক প্রভাবকে সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হলে সরকারকে সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিতেই হবে। একই সঙ্গে এ সুরক্ষা কর্মসূচির প্রধান সুবিধাভোগী করতে হবে শ্রমিকদেরই।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ধস নেমেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। শঙ্কা তৈরি হয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়েও। বিভিন্ন দেশ অর্থনীতিকে বাঁচাতে এরই মধ্যে বিশেষ জরুরি তহবিল গঠনসহ নানা ধরনের সহায়তা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পরিকল্পনার সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা শিল্প মালিকদের। এক্ষেত্রে ধরে নেয়া হয়, শিল্প মালিক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধান সুবিধাভোগী হলে উৎপাদন ও ব্যবসা চালু থাকবে। ফলে শ্রমিকদের আয়-উপার্জনও খুব একটা ব্যাহত হবে না।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন থেকে শুরু করে উৎপাদন, চাহিদা, ভোগ পর্যন্ত সবকিছুকেই ধসিয়ে দিয়েছে নভেল করোনাভাইরাস। পড়তি চাহিদার বাজারে উৎপাদন চালু রেখে ব্যবসা স্বাভাবিক রাখা হয়ে পড়েছে প্রায় অসম্ভব। ফলে মালিকের হাত ঘুরে কারখানাগুলোর শ্রমিকদের হাতে এ সুবিধা পর্যাপ্ত বা যথাযথ আকারে পৌঁছার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পড়তি ব্যবসার বাজারে ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা থেকে কর্মহীনও হয়ে পড়তে পারে অনেকে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বা শিল্প মালিক যদি হয় অর্থনীতির রেন্ট সিকার (লুটপাটকারী) গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাহলে এ নিশ্চয়তা একেবারেই শূন্য। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। এ কারণে অর্থনীতিতে নভেল করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবকে সীমাবদ্ধ রাখতে গঠিত তহবিলের অর্থ বণ্টন ও সুরক্ষা পরিকল্পনায় শ্রমিকদের গুরুত্ব দেয়াটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।

বিষয়টিকে অনুধাবন করতে পেরে যুক্তরাজ্যও এরই মধ্যে নিজস্ব ৩ হাজার কোটি পাউন্ডের করোনাভাইরাস বেইলআউট কার্যক্রমের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছে শ্রমিকদের। দেশটির সরকার এরই মধ্যে শ্রমিকদের মাসিক বেতনের ৮০ শতাংশ (সর্বোচ্চ আড়াই হাজার পাউন্ড পর্যন্ত) বহনের ভার নিয়ে নিয়েছে। এতে করে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়লেও শ্রমিকরা যাতে চাকরিচ্যুত না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্প মালিকদেরও দেউলিয়াত্বের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। এছাড়া সমাজের সবচেয়ে নাজুক অংশটির সুরক্ষার জন্যও ৭০০ কোটি পাউন্ডের তহবিল রাখা হয়েছে এ বেইলআউট কার্যক্রমে।

যুক্তরাজ্যের এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশও। বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের কারখানা আছে ৪৬ হাজার ২৯১টি। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৬৮৯ অতিক্ষুদ্র শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৭২০ জন শ্রমিক-কর্মকর্তার। ২৩ হাজার ৫৫৭টি ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-কর্মকর্তার সংখ্যা ১১ লাখ ২৭ হাজার ৮৪১। ৪ লাখ ৬১ হাজার ১৪২ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা রয়েছেন ৩ হাজার ১৪টি মাঝারি প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া ৩ হাজার ৩১টি বৃহদায়তন কারখানায় শ্রমিক-কর্মকর্তা রয়েছেন ৪০ লাখ ২৭ হাজার ১৪১ জন। সব মিলিয়ে এসব কারখানায় কাজ করছেন ৫৮ লাখ ৭৯ হাজার ৮৪৪ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা। এদের মধ্যে শুধু শ্রমিক রয়েছেন ৫০ থেকে ৫৫ লাখ। বর্তমানে এ সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি হবে না।

করোনার কারণে লকডাউনে যাওয়ার পর যদি উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সরকারকে অন্তত দুই মাসের জন্য শ্রমিকদের সবার বেতনের ব্যয়ভার কাঁধে তুলে নিতে হবে। এতে করে এসব শ্রমিকের বেকার হওয়ার শঙ্কাও অনেকখানি কমে আসবে।

এ উদ্যোগের পরোক্ষ সুবিধাভোগী হবেন শিল্প মালিকরাও। কারণ তাদের ব্যবসায়িক ব্যয়ের বড় অংশই খরচ হয় শ্রমিকের বেতন-ভাতা বাবদ।

এক্ষেত্রে যদি মাথাপিছু সর্বোচ্চ মাসিক ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়, আগামী দুই মাসে ৬০ লাখ শ্রমিকের বেতন বাবদ সরকারের ব্যয় করতে হবে সর্বোচ্চ ১২ হাজার কোটি টাকা। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা ব্যাংকগুলোকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে এ অর্থ সহজেই পৌঁছে দেয়া সম্ভব।

এ অর্থের সংস্থান নিয়ে সরকারের খুব একটা দুশ্চিন্তাও করতে হবে না। বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাবদ সরকারের বরাদ্দ রয়েছে ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। সেখান থেকে খাতওয়ারি সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে এ অর্থের সংস্থান করা সম্ভব। এছাড়া বাস্তবায়নাধীন বড় বড় প্রকল্পের কার্যক্রম কিছুটা শ্লথ করে আনাসহ আরো নানাভাবে এ অর্থ সমন্বয় করা সম্ভব। এছাড়া একেবারে অপরিহার্যগুলো বাদ নিয়ে অন্য ব্যয়ের খাতগুলোয় কিছুটা কৃচ্ছ সাধনের মাধ্যমেও এটি সমন্বয় করা যাবে।

৬০ লাখ শ্রমিককে সুরক্ষার আওতায় আনা না গেলে তা হয়ে উঠতে পারে অস্থিরতাসহ বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ, যা নভেল করোনাভাইরাসজনিত সংকটকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মালিকদের চেয়ে আতঙ্ক বেশি শ্রমিকদের। কারণ বিষয়টি শ্রমিকদের অস্তিত্বের। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে ঢালাওভাবে শ্রমিকদের চাকরি থেকে বিদায় করে দেয়া। দুর্ভাগ্য হলো কোনো আঘাত বা বিপর্যয় এলে প্রভাবটা শ্রমিকের ওপর বেশি পড়ে। আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো সুবিধার মূলে থাকতে হবে শ্রমিকের সুরক্ষা।

এছাড়া এসব শ্রমিকই দেশের ভোক্তাশ্রেণীর বড় একটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাদেরসহ সার্বিক ভোক্তা খাতের ক্রয়ক্ষমতা ধরে অর্থনীতিতে চাহিদাও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে, যার ধারাবাহিকতায় কভিড-১৯-জনিত ক্ষতিও দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এছাড়া শিল্প মালিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে সুরক্ষার আওতার বাইরে থাকছে, তা-ও নয়। দেশে এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত বেশকিছু নীতিসহায়তার ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ঋণের অর্থ পরিশোধ না করলেও কোনো ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি করা হবে না। একই সঙ্গে রফতানির অর্থ দেশে আনা ও আমদানি দায় পরিশোধের মেয়াদ ৬০ দিন করে বাড়ানো হয়েছে। ১৮০ দিন বাড়ানো হয়েছে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আওতায় স্বল্পমেয়াদি সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিটের মেয়াদ। রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে ৯০ দিন। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব সুযোগ-সুবিধা কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় শিল্পোদ্যোক্তারা বেঁচে থাকতে পারবেন। কিন্তু শ্রমিকদের আয় কম। আর আয়ের উৎসও একটাই। তাদের কোনো সঞ্চয় নেই। এ প্রেক্ষাপটে বিপর্যয়ের শঙ্কা শ্রমিকদেরই বেশি। এজন্য শ্রমিকদেরই হতে হবে সুবিধার অন্যতম ভাগিদার। তারা যাতে চাকরিচ্যুত না হন, নিয়মিত বেতন যাতে পান, এগুলো নিশ্চিত করার জন্য স্টিমুলাস প্যাকেজের উদ্দেশ্যও হতে হবে শ্রমিককেন্দ্রিক।

এক্ষেত্রে মালিকপক্ষেরও কিছু দায়িত্ব থেকে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুবিধা শুধু সরকার দেবে তা নয়, যিনি নিয়োগকর্তা তাকেও সুবিধা দিয়ে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাই বেশি বিপর্যয়ে থাকবেন। ফলে তাদেরও বাঁচিয়ে রাখতে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পোদ্যোক্তাও সুবিধার প্রাপক হতে পারেন। তবে তা ছোটরা, যাদের সক্ষমতার ঘাটতি আছে। এ ধরনের উদ্যোক্তা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও ব্যাংকঋণ পান না, ফলে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়াস থাকতে হবে। একমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই সুবিধা প্রদান ও ভোগের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব, সুতরাং স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুবই প্রয়োজন, যা কাজে লাগিয়ে সঠিক নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এখন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা কার্যক্রমের প্রধান সুবিধাভোগী করার বিপক্ষে মত উঠছে। ২০০৮ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৩ লাখ কোটি ডলারে। সুদহার শূন্য বা এর কাছাকাছি ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের দায় কমিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ পুঞ্জীভূত ঋণের অর্থ ব্যবহার করে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বা কর্মীর দক্ষতা বাড়ানোর বদলে নিজেদের শেয়ার কিনে নেয়াসহ নানা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে করে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়া ছাড়া আর কারো কোনো উপকার হয়নি। এতে করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা সহ্যের সক্ষমতা হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের দেয়া করের অর্থে গঠিত সরকারি সুরক্ষা তহবিলের প্রধান সুবিধাভোগী করার বিপরীতে মত দিচ্ছেন অনেকেই।