কৃষকদের জন‍্য গ্রামের বাজারে বাজারে এটিএম বসাতে চাই

274

ড. যশোদা জীবন দেবনাথ একজন ব্যবসায়ী। টানা চারবার শিল্প মন্ত্রণালয কর্তৃক সিআইপি নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি অনুমোদন পাওয়া দেশের নতুন প্রজন্মের বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক এর উদ্যোক্তা পরিচালক এবং টেকনো মিডিয়া লিমিটেড, মানি প্যাটেন্ট লিংক প্রাইভেট লিমিটেড ও পে-ইউনিয়নের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও তিনি।

এছাড়াও তিনি প্রোটেকশন ওয়ান প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও ধানমন্ডি ক্লাবের পরিচালক। একই সাথে রাজেন্দ্র ইকো রিসোর্টস, বাইব্রেন্ড সফটওয়্যার বিডি লিমিটেড, কার্ডস এন্ড পেমেন্ট সল্যুশনস লিমিটেডসহ প্রতিষ্ঠা করেছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইবিএ থেকে পড়াশুনা করেছেন এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে। তিনি একই সাথে একজন দানবীর হিসেবে দেশের অসহায় মানুষের কাছে সমাদৃত।

যশোদা জীবন ফরিদপুরের সদর উপজেলার চাদঁপুর ধোপাডাঙ্গা গ্রামে এক উচ্চ বংশীয় ব্রাক্ষণ ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন। এরপর সরকারী রাজেন্দ্র কলেজে পড়াশুনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সম্প্রতি তিনি তার গাজিপুরের রিসোর্টটি করোনা আক্রান্তদের আইসোলেশনের জন্য সরকারের কাছে ছেড়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সার্বিক বিষয় নিয়ে বিজনেস আই থেকে তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন মাহমুদ উল্লাহ।

jibon-debnath.jpg

বিজনেস আই:ফেসবুকে আপনার একটি স্ট্যাটাস ঘুরছে যে, আপনি গাজিপুরে আপনার রিসোর্ট যেখানে ১০০ টি রুম রয়েছে, তা করোনা চিকিৎসা ও আইসোলেশনের জন্য সরকারকে দিতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে সরকার কি আপনার সঙ্গে কোন ধরণের যোগাযোগ করেছে?

ড. যশোধা দেবনাথ: না, সরকার এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কোন যোগাযোগ করেনি। এ নিয়ে আমিও সরকারের সঙ্গে কোন যোগাযোগেরও চেষ্টা করিনি। আমার গ্রামের বাড়িও আমি সরকারের সাহায্যে ব্যবহারের জন্য সেই স্ট্যাটাসে বলেছি।

বিজনেস আই: আচ্ছা আপনার পরবর্তী কোন পরিকল্পনা কি রয়েছে করোনা বিষয়ে?

ড. যশোধা দেবনাথ: আমরা এখন ঘরেই আটকে আছি। এভাবেই যা করতে পারছি, করছি। আমার একটা ফিলোসফি রয়েছে, যেভাবে পারি মানুষকে সাহায্য করি। আমার রিসোর্ট খালি পড়ে আছে। সেটা যদি মানুষের কোন কাজ লাগে সেই চেষ্টাই করছি। যদি কোনভাবে রিসোর্টটি এই সময় মানুষের কাজ লাগতো, তাহলে গর্ববোধ করতাম। আমি মনে করি যাদের এরকম সুযোগ রয়েছে, সবারই এই সময় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিৎ। এছাড়া আমরা একটা ফান্ড যোগাড়ের চেষ্টা করছি নিজ উদ্যোগে। গতকাল আমার কাছে ৩০০ পিপিই ও ৫০০ মাস্ক এসে পৌছেছে, সেগুলো সকালে ফরিদপুররের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করবো। ২/৩০০ মানুষের খাবার প্যাকেট তৈরি করেছি, সেগুলোও মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছি। যারা খেতে পরতে পারছে না এই মুহুর্তে তাদের জন্য আমাদের এই আয়োজন। এর বাইরে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েও কাজ করছি। আমরা এখন একটি গ্লোবাল ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আশা করি আমরা এই ক্রাইসিস ভালোভাবেই ওভারকাম করতে পারবো। আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুব ভালো সময়ে ও ভালোভাবেই করোনা ভাইরাসের এই সমস্যা নিয়ে এগিয়ে এসেছে বলে আমরা এই দু:সময় ওভারকাম করতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।

বিজনেস আই: আপনার এসব সামাজিক দায়িত্ব পালন করে কেমন সাড়া পাচ্ছেন ?

ড. যশোধা দেবনাথ: খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি (হেসে) । অনেকেই আমাকে সহযোগীতা করতে চেয়েছেন। আমি যেসব সামাজিক দায়িত্ব পালন করি, তা আবার ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে জানান দিয়ে থাকি। এতে বিভিন্ন মানুষজন অনুপ্রাণিত হয়। আমার ফেসবুকের স্ট্যাটাস দেখে আমার প্রায় ২০ জন বন্ধু আমাকে জানিয়েছে তারাও এই কাজে অংশগ্রহণ করতে চায়। এটাই আমার সফলতা, আমি আমার কাজ দিয়ে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছি। আমি মনে করি সবাইকেই এভাবে কাজ করা উচৎ। মানুষজনকে ইন্সপায়ার করে সাধারণ মানুষের জন্য এগিয়ে আসা উচিৎ। যার যা সাধ্য রয়েছে সেই মতো।

বিজনেস আই: আচ্ছা আপনি তো ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে কাজ করেন, সেই বিষয়ে কোন মতামত ?

ড. যশোধা দেবনাথ: আমি বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম মেশিন নিয়ে কাজ করি। বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বিভিন্নভাবে ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। অথচ সারা দেশে মাত্র ১০০০০টি এটিএম মেশিন রয়েছে। এই মেশিন যদি আরো বাড়ানো যেতো তাহলে ভালো হতো। গ্রামগঞ্জে বা ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে যদি বাজারে বাজারে এটিএম বসানো যেতো তাহলে একজন কৃষক সহজে ওয়ার্কিং আওয়ারের বাইরেও টাকা উত্তোলন করতে পারতো। তার কৃষিকাজ ফেলে দিনের বেলাতেই ব্যাংকে যেতে হতো না, দেখা গেলো সন্ধ্যায় গিয়ে তিনি এটিএম মেশিন থেকে টাকা তুলছে।

বিজনেস আই: সব ব্যাংকগুলোকে এক এটিএম ব্যবহারের জন্যও আপনারা কাজ করছেন যতদূর জানি।

ড. যশোধা দেবনাথ: হ্যা, আমরা হোয়াইট লেভেল এটিএম নিয়েও কাজ করছি। যেখানে কোন এটিএম কোন ব্যাংকের আওতায় থাকবে না। যেকোন ব্যাংকের গ্রাহক চাইলে যেকোন এটিএম থেকেই তার টাকা তুলতে পারবেন। সব এটিএম বুথই কমন এটিএমব এটিএম বুথই কমন এটিএম বুথ হিসেবে ব্যবহার হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের কথা চলছে। আমরা অনেকদূর এগিয়েছি।

এগুলো যেমন আমাদের ব্যাবসায়িক দায়িত্ব তেমনই এটা আমাদের সামাজিক দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। কারণ ব্যাংকিং সেক্টরকে দেশের সব মানুষের হাতের কাছে পৌছে দেয়া ও দেশকে ডিজিটালাইজেশন কওে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও একটি সামাজিক দায়িত্ব।

বিজনেস আই: কি ধরণের সমস্যার মধ্য দিয়ে আপনাকে আজকের এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে?

ড. যশোধা দেবনাথ: দেখুন, এটিএম নিয়ে আমাদের দেশে কোন পড়াশুনা নেই। আমাদেরকে যা করতে হয়েছে তা ভার্চুয়াল ইউনিভার্সিটিতে পড়েই করতে হয়েছে। এখনকার তরুণরাও এই ভার্চুয়াল ইউনিভার্সিটিতেই পড়ে নিজেকে তৈরি করছে। এটা অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা। তবে এ সেক্টরে কাজ করার জন্য তরুণদের অনেক জায়গা রয়েছে এবং তা সামনে আরো বাড়বে।

বিজনেস আই: এই সেক্টর নিয়ে দেশের ভবিষ্যত কেমন মনে করছেন আপনি?

ড. যশোধা দেবনাথ: আমাদের দেশের প্রায় ৪ লাখ তরুণ ফিল্যান্সিং এর কাজ করে। ভবিষ্যতে এটা আমাদের একটি বড় আয়ের উৎস হতে পারে, এখন ফ্রিল্যাস থেকে তরুণরাা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার যোগান দিচ্ছে। যা গার্মেন্ট সেক্টরের পরে আমাদের জিডিপিকে শক্তিশালী করছে। তাই বলবো সরকারের এই দিকে আরো ভালোভাবে নজর দেয়া উচিৎ। যদিও সরকার ভালোভাবেই নজর দিচ্ছে ও সহযোগীতা করছে।

আর এখন টেকনোলজির যুগ। এই মুহুর্তে টেকনোলজি ছাড়া কোন দেশ বেশিদূর আগাতে পারবে না। তাই আমাদেরকে টেকনোলজির সাহায্য নিতেই হবে। সেই টেকনোলজি নিয়েই আমার কাজ। আমাদের জিডিপি গ্রোথ অনেক হাই। এই গ্রোথ ধরে রাখতে হবে। সরকার বিভিন্ন হাইটেক পার্ক তৈরি করেছে, বিভিন্ন শিল্প অঞ্চল তৈরি করেছে। এসব কাজে সরকার অনেক এগিয়ে এসেছে। এখন আমাদের দিকেও সরকার একটু নজর দিলে ব্যাংকিং খাত অনেক দূর যেতে পারবে। যা দেশের অর্থনীতিতে সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদেরকে সম্বলিতভাবে একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করতে হবে।

বিজনেস আই: সরকারের কাছে আপনার কোন চাওয়া আছে কি?

ড. যশোধা দেবনাথ: সরকার কম্পিউটার ইম্পোর্টে কোন ধরণের কর নিচ্ছে না, কিন্তু এটিএম মেশিন ইমপোর্ট করতে গেলে ৩২ শতাংশ কর দিতে হয়। অথচ কিছু কম্পিউটার ডিভাইস দিয়েই একটি এটিএম মেশিন তৈরি। সরকার এই কর না নিলে আমরা গ্রাম ও ইউনিয়ন পরিষদে এটিএম নিয়ে যেতে পারতাম। যা আমাদের অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করতো।

একটা জিনিস খেয়াল করবেন। এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করে প্রায় ১২ লাখ মানুষ। এই ১২ লাখ মানুষ যদি প্রতিদিন ব্যাংকে যেতো তাহলে ব্যাংকের কি অবস্থা হতো? বুথে প্রতি কার্ড হোল্ডারের জন্য ব্যাংকের ২০ টাকা খরচ হয়। অথচ ব্যাকে একজন গ্রাহকের জন্য ব্যাংক খরচ করে ১০০ টাকা। এই খরচ কমাতে হলেও ব্যাংকের এটিএম মেশিনের বিকল্প নেই। এছাড়া সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে, ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে ৬ টাকার বেশি সুদ দিতে পারবে না। তাই মানুষ আর এখন ব্যাংকে টাকা রাখবে না। যেকারণে ব্যাংকের মুনাফাও কমে আসবে। তাই বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংকগুলো এখন খরচ কমানোর চেষ্টা করছে। এজন্যই তাদের এটিএম বুথ আরো বেশি প্রয়োজন।

ব্যাংককে মানুষের হাতের মুঠোয় নিয়ে যেতে হবে। ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আমরা এসব নিয়েও সর্বপরি কাজ করছি।

বিজনেস আই: আপনার ব্যবসার ধরন সম্পর্কে আমাদের কিছু জানান।

ড. যশোধা দেবনাথ: বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে আমি কাজ করছি। আমাদের বিস্তর কাজ করতে হয়। প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংক আমাকে ৫০০ কোটি টাকা দেয়, তা বিভিন্ন এটিএম মেশিনে যোগান দেয়ার জন্য। এসব ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট এর পাশাপাশি দেশের ৮০ শতাংশ ব্যাংকগুলোর কার্ডও আমরা তৈরি করি। এছাড়াও ৩০টি ব্যাংকের চেক বই আমরা ছাপিয়ে দেই।

বিজনেস আই: কোন বিষয়গুলো আপনাকে এতদূর নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে?

ড. যশোধা দেবনাথ: আমার আজকের এই অবস্থানে আসতে সাহায্য করেছে, পরিশ্রম, সততা ও অর্থের সমন্বয় ও তার সঠিক ব্যবহার। এগুলোই আমার পাওয়ার অব সাকসেস। একটা জিনিস না বললেই নয়, এই সেক্টরে বিশ্বাস-সততা ছাড়া কোনভাবেই আগানো সম্ভব না। বিশ্বাস না থাকলে ব্যাংকগুলো তাদের চেকবই আমাকে দিয়ে ছাপাতো না। প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাকে ৫০০ কোটি টাকা দেয়। এই ব্যবসা একমাত্র বিশ্বাসের উপরই দাড়িয়ে রয়েছে।

বিজনেস আই: তরুণদের জন্য কোন পরামর্শ?

ড. যশোধা দেবনাথ: তরুণদের জন্য বলবো, জিরো থেকে ১ বানাও, ১ থেকে ২, ৩ নয়। জিরো থেকে শুরু করতে হবে।

বিজনেস আই: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এরকম সময়ে সময় দেয়ার জন্য।

ড. যশোধা দেবনাথ: আপনাকে ও বিজনেস আইকেও অনেক ধন্যবাদ।