স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৭

6

আজ ১৪২৭ সনের প্রথম দিন বাংলা নববর্ষ। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে বাঙালিরা নতুন বছরের আনন্দে আয়োজনে মেতে উঠেন। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। করোনাভাইরাস মহামারি আকার নেওয়ায় এ বছর নববর্ষ উদযাপন হচ্ছে না। এবারের বর্ষবরণে নেই কোনো আয়োজন। নেই কোনো আনন্দ। সরকারি, বেসরকারি সব অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। এককথায় করোনায় মলিন হয়ে গেছে এবারের বাংলা নববর্ষ।

ঐতিহাসিকদের মতে, বৈদিক যুগে বাংলা সনের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। মোগল সম্রাট আকবর ফসলি সন হিসাবের সুবিধার্থে বৈশাখ মাসকে প্রথম মাস ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু করেন। নবাব মুর্শিদকুলি খান বৈশাখ মাস থেকে বাংলায় প্রথম খাজনা আদায় শুরু করেন। জমিদারি আমলে বৈশাখের মূল আয়োজন ছিল খাজনা আদায় উপলক্ষে ‘রাজপুণ্যাহ’ ও ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ উৎসব। জমিদারি প্রথা বিলোপের পর রাজপুণ্যাহও বিলুপ্ত হয়। আর আধুনিক সময়ে অর্থনৈতিক লেনদেনের ধারায় পরিবর্তন আসায় হালখাতাও তার জৌলুস হারিয়েছে। বর্তমানে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে তাই মুখ্য হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, যা প্রবর্তনের কৃতিত্ব পুরোটুকুই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনি শান্তি নিকেতনে প্রথম ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। বর্তমানে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এসেছে নতুন এক গতিশীলতা।

বর্ষবরণ উপলক্ষে আজ পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটি। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিও এদিন। দিবসটি উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামও পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সংবাদপত্রগুলোও প্রকাশ করছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

এদিকে বাংলা সনের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটি সনাতন বাঙালির লৌকিক আচারের চৈত্রসংক্রান্তি। বছরের শেষ এই দিনটি নিয়ে প্রতিবছর নানা আয়োজন থাকে। কিন্তু গতকাল একবারে নীরবেই বছরের শেষ দিনটি অতিবাহিত হয়েছে। প্রতিবছর রাজধানীতে গ্রম্নপ থিয়েটার ফেডারেশন ও গানের দল সুরের ধারা দিনটি ব্যাপক আয়োজনে উদযাপন করলেও এবার কোনো আয়োজন নেই। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে সুরের ধারার চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠান রাতভর চলার পর শেষ হয় হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণের মধ্য দিয়ে। এবার এ অনুষ্ঠানটি হলো না। নাগরিক জীবনে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোধা সংগঠন ছায়ানটও তাদের ঐতিহ্যবাহী রমনা বটমূলের প্রভাতী অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। তবে আগের বছরগুলোর নানা গান নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে ছায়ানট। ডিজিটালি বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে ‘উৎসব নয়, সময় এখন দুর্যোগ প্রতিরোধের’-এ প্রতিপাদ্যে এ বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়েছে?নবসজ্জার অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে পহেলা বৈশাখ ভোর ৭টা থেকে। অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে সাম্প্রতিক নানা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের নির্বাচিত গান এবং বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুনের সমাপনী কথন দিয়ে। যা বিটিভি ছাড়াও ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেলেও সম্প্রচারিত হবে।

এ প্রসঙ্গে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, বর্তমান মহামারিতে বিশ্বজুড়ে অগণ্য মানুষের জীবনাবসান ও জীবনশঙ্কার ক্রান্তিলগ্নে ছায়ানট এবার ‘উৎসব নয়, সময় এখন দুর্যোগ প্রতিরোধের’ এই অঙ্গীকার নিয়ে সীমিত আকারে অনুষ্ঠান উপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু করা ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে প্রতিবছর রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের ভোরে বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে আসছে। এর আগে মাত্র একবার মুক্তিযুদ্ধকালে অনুষ্ঠানটি হয়নি। এবার দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে।