ভিয়েতনামে করোনায় কোন মৃত‌্যু নেই

11

এই মুহুর্তে পৃথিবী সব চেয়ে ভাগ্যবান দেশের নাম কি? ভিয়েতনাম, কারণ করোনায় যখন সারাবিশ্ব মৃত্যুর সংখ্যা আড়াই লাখ প্রায়। অথচ প্রায় ১০ কোটি মানুষের দেশ ভিয়েতনামে এখনো কেউ এই ভাইরাসে মারা যায়নি। ২৭০ জন সেখানে সংক্রমিত হয়েছে। তার মধ্যে ২২০ জন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে গেছে। দেশটিতে সর্বশেষ ছয় দিনে কেউ সংক্রমিত হয়নি।

ভাইরাসের উৎপত্তি চীনের সীমান্তবর্তী দেশ ভিয়েতনাম। চীনে ভিয়েতনামের হাজার হাজার মানুষ কর্ম করে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তারপরও ভাইরাসে কাবু হয়নি ভিয়েতনাম। কীভাবে ভাইরাস মোকাবিলায় ভিয়েতনাম এতোটা সাফল্য দেখালো?

ভিয়েতনামে সেই জানুয়ারি থেকে করোনা সংক্রমণের পরীক্ষা শুরু হয়। স্বাস্থ্যখাত উন্নত না হলেও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেশটিকে করোনার হাত থেকে অনেকাংশে বাঁচিয়েছে। রোগ ধরা পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি দেশটির নেতারা। তার আগেই মাঠে নামে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। কমিউনিটিজুড়ে শুরু হয় করোনা প্রচার ও সচেতনতার কাজ।

জনসমাগমস্থলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। রাস্তায় রাস্তায় ‘মাস্কের ফ্রি এটিএম বুথ’ খোলা হয়। ভিয়েতনামে আসা সব নাগরিককে বাধ্যতামূলক আইসোলেশনে নেওয়া হয়। বিদেশিদের আসায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। হোটেল ও সামরিক ছাউনিগুলোর অনেকটিকে অস্থায়ী হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র বানিয়ে ফেলা হয়। বিমানবন্দরেও বিনা খরচে ভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়।

যে এলাকায় সংক্রমণের খবর মিলত, সেখানে পুরো এলাকাকে কোয়ারেন্টিন করে টেস্ট শুরু হতো। কোয়ারেন্টিন করা জায়গার আশপাশেই খোলা হতো অস্থায়ী আশ্রয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র। ফার্মাসিগুলো থেকেও তথ্য নেওয়া শুরু হয়, কে কী ওষুধ কিনেছে। সেই ইতিহাস ধরেও দেশটিতে টেস্ট করা হয় অনেক।

মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ রোগী থাকার পরও এপ্রিলে এসে দেশটি করোনাসংকটকে ‘জাতীয় মহামারি’তুল্য সমস্যা ঘোষণা করে। এতে পুরোনো প্রশাসনিক উদ্যোগগুলোই আরও জোরালো করা হয়। ফলে দেশটির অর্থনীতি গত কয়েক মাসে তেমন হোঁচট খায়নি।

ভিয়েতনামের নীতিনির্ধারকেরা কেবল ভাইরাসকে থামিয়েই নিজেরা থামেননি; দেশটিতে সংক্রমণ কম থাকা সত্ত্বেও ভাইরাসযুদ্ধে সেখানকার সরকারের আরেকটি বড় উদ্যোগ ছিল ‘টেস্ট কিট’ নিয়ে গবেষণা এবং এটা তৈরিতে নামা। এ ক্ষেত্রে তারা এখন বিশ্বজুড়ে দৃষ্টান্ত। জানুয়ারিতেও তারা কোরিয়া থেকে কিট আমদানি করেছিল। এপ্রিলে এসে দেখা যাচ্ছে, কিটের গবেষণা ও উৎপাদন শেষে তারা সেটা প্রায় ২০টি দেশে রপ্তানি শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে ‘মেড ইন ভিয়েতনাম’ কিটের স্বীকৃতি দিয়েছে। ইরান, ফিনল্যান্ড, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশে যাচ্ছে এখন ভিয়েতনামের কিট। আমেরিকা বলছে, তারাও এটা নিতে ইচ্ছুক।

ডাক্তার ও নার্সদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ কম রাখতে ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য প্রশাসন হাসপাতালের রুমগুলো পরিষ্কার করাসহ অনেক কাজে রোবট ব্যবহার করেছে।

কোনো মৃত্যু না থাকার পরও ভিয়েতনাম জাতীয় মহামারির ঘোষণা এখনই প্রত্যাহার করতে অনিচ্ছুক। যেহেতু বিশ্বজুড়ে সংক্রমণ এখনো উচ্চমাত্রায় অব্যাহত আছে, তাই হ্যানয় সরকার মনে করছে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’র ঘোষণা দিলে সংক্রমণের দ্বিতীয় তরঙ্গ দেখা দিতে পারে। ফলে, এপ্রিলজুড়েও দেশটিতে কোভিড-১৯–কেন্দ্রিক সব সতর্কতা বহাল ছিল। কেবল অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল খুলে দেওয়া হয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৩-এ সার্স ভাইরাসের সময়ও এশিয়ার এই অঞ্চলে ভিয়েতনামই প্রথম নিজেকে তার থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছিল।