hasina

‘পুঁজিবাজারে আনতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বসা উচিত’

একান্ত সাক্ষাৎকারে আবু আহমেদ

132

মহামারি করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত পুরো বিশ্ব। এ অবস্থায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির অন্যতম খাত পুঁজিবাজারও সংকটে পড়েছে। করোনা পরবর্তী দেশের অর্থনীতি কি অবস্থায় দাঁড়াবে, কি পদক্ষেপ নিলে দেশের পুঁজিবাজার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদের সঙ্গে। কথা বলেছেন বিজনেস আই বাংলাদেশ-এর নিজস্ব প্রতিবেদক মাহমুদ উল্লাহ। পুঁজিবাজারের বর্তমান করণীয় ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কি হতে পারে এ বিষয়ে তার বিশ্লেষণধর্মী মতামত পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো-

বিজনেস আইঃ করোনার কারণে পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ রয়েছে। এতে সমস্যায় পড়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। করোনা পরবর্তী সময়ে তারা কি পদক্ষেপ নিতে পারেন?

আবু আহমেদঃ বিনিয়োগকারীদের ভালো করতে হলে সমগ্র পুঁজিবাজারের অবস্থাই ভালো হতে হবে, তাহলেই একমাত্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারেন। মার্জিনলোনে যারা আছে তাদের সুদ ৫ শতাংশ কমানো যেতে পারে। এছাড়া মেইনটেন্যান্স ফি ছেড়ে দেয়া উচিৎ। তাহলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ কমানো যেতে পারে।

বিজনেস আইঃ অনেকদিন ধরেই বড় বড় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তারা এখনও তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। এর কারণ কি হতে পারে?

আবু আহমেদঃ অবশ্যই বহুজাতিক ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনা উচিত। প্রয়োজনে কর্পোরেট ট্যাক্স ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে হলেও। ভারত আমেরিকার তুলনায় আমাদের কর্পোরেট ট্যাক্স এমনিতেও বেশি। আমাদের দেশে যারা ভালো কোম্পানি তারাও ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, টাকা বিদেশে পাচার করে। ইচ্ছে করে তারা টাকা কম দেখায়। ট্যাক্স কমালে কোম্পানিগুলো ডিভিডেন্ট বাড়াতে পারবে।
সোনালী, জনতা এসব সরকারি ব্যাংকগুলোর শেয়ার কেনা উচিত। সরকার এদেরকে শেয়ার কেনার জন্য বলেছে। তারপরও তারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেমন, ইউনিলিভার, ইনসেপটা, মেটলাইফ, নেসলে, সিমেন্স, এইচএসবিসি এদেরকে লিস্টেড করা উচিত। বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে এরা তালিকাভুক্ত, অথচ বাংলাদেশের বেলায় এদের গড়িমসি। সরকার এদের সঙ্গে প্রয়োজনে বসে এদেরকে মার্কেটে নিয়ে আসা উচিত। কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার হলেও জনগণের কাছে ছেড়ে দেয়া উচিত এদের।
abu ahmed
বিজনেস আইঃ সরকার অনেক চেষ্টা করেও এসব বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে পারছে না। এসব কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে আসতে বাধা কোথায়?

আবু আহমেদঃ অনেকও চেষ্টা করেও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীরা এদেরকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে পারছে না। তিনমাসে অডিট করতে হয়, অডিট প্রকাশ করতে হয়, কতটাকা বাৎসরিক লাভ হয়েছে তা প্রকাশ করতে হয়, এসব কারণে হয়তো তারা দেশের পুঁজিবাজারে প্রবেশ করতে চাচ্ছে না। আরো অনেক কারণ অবশ্য রয়েছে। আমাদের মন্ত্রীরাও তেমন চেষ্টা করছেন না হয়তো, যে কারণে তাদেরকে নিয়ে আসতে পারছেন না। আগের অর্থমন্ত্রীকেও দেখেছি, তাদের আনতে পারেননি। এবারকার অর্থমন্ত্রীতো পুঁজিবাজারেরই মানুষ। তিনিও পারছেন না, ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এত কিছু করেন, এত মানুষের সঙ্গে বসেন, তিনি পারেন না এদের সঙ্গে বসতে, এদেরকে বুঝিয়ে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে? তিনি বসলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। তাহলে দেশের পুঁজিবাজার যেমন চাঙ্গা হতো, তেমনি দেশের অর্থনীতিও চাঙ্গা হতো।

বিজনেস আইঃ এসব বিষয় দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) রয়েছে। তাহলে সরকারকে কেন উদ্যোগ নিতে হবে?

আবু আহমেদঃ বিএসইসি’র কথা শুনবে না এরা। তাদেরকে মূল্যায়ন করে না এসব কোম্পানি। তারা যদি এদেরকে কথা শুনাতে পারতো, তাহলে এতদিনে এরা পুঁজিবাজারে থাকতো। এসব বিষয় অর্থমন্ত্রণালয় দেখতে পারে। তাদের ছাড়া কারো কথা শুনবে না এসব কোম্পানি। তাই বলছি অর্থমন্ত্রণালয়কেই এদেরকে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে হবে।

বিজনেস আইঃ আইন করে কি এসব কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা যায় না?

আবু আহমেদঃ আইন করলে আবার বিদেশি কোম্পানি এদেশে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। তবে ভারতে আইন করেই এদেরকে তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। মোবাইল কোম্পানি বাজারে আসবে, তারা কিছু সুযোগ সুবিধা চেয়েছে। সরকারের তা দেয়া উচিত। খুব শিঘ্রই এরা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। এসব বড় কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হলে আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্যই ভালো। অনেক দেশই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে বাজার শক্তিশালী হয়েছে।

বিজনেস আইঃ করোনার কারণে ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে পুঁজিবাজার। এতে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় দেশের পুঁজিবাজার কি এখন খুলে দেয়া উচিত বলে মনে করেন?

আবু আহমেদঃ এখন প্রায় সব দেশেরই পুঁজিবাজার খোলা। ভারত, আমেরিকা, থাইল্যান্ড, সানহাইসহ সব। শুধু বাংলাদেশেই বন্ধ। এখনই দেশের পুঁজিবাজার খুলে দেয়া উচিত। বিভিন্ন জায়গায় কথা হলে আমি খুলে দেয়ার কথাই বলছি।

বিজনেস আইঃ করোনার কারণে সারাবিশ্বে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। করোনার পরে দেশের অর্থনীতির অবস্থা কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

আবু আহমেদঃ করোনায় দেশের অর্থনীতি কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার উপর নির্ভর করবে দেশের অর্থনীতির অবস্থা। আর এখন সব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা খুলে দেয়া উচিত। ট্রান্সপোর্ট, ব্যবসা বানিজ্য, দোকান, কারখানা সব খুলে দেয়া উচিত। অন্তত স্বল্প পরিসরে হলেও। নইলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

বিজনেস আইঃ অনেকেই বলছেন টাকা ছাপিয়ে দেশের এই অবস্থা মোকাবেলা করা উচিত। আপনিও কি তাই মনে করেন?

আবু আহমেদঃ সরকার যেসব প্রণোদনা দিচ্ছে, তা ঋণ নিয়ে দিচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সরকার ঋণ চেয়েছে, নিচ্ছে। এসব ঋণ ঢুকলেও তো মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে।

বিজনেস আইঃ শক্তিশালী বন্ড মার্কেট তৈরির জন্য আমরা কি করতে পারি?

আবু আহমেদঃ এদেশে শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে উঠবে না। কারণ তারা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের প্রণোদনা পায়। ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পায়। এভাবে সরকারি প্রণোদনা দিয়ে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী হতে পারে না। দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দেয়াকে নিরুৎসাহিত করতে হবে, তবেই বন্ড মার্কেট দাঁড়াতে পারে। বন্ড মার্কেটকে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্তি করতে হবে। মানুষ শেয়ারের মাধ্যমে বন্ড কিনবে। তাহলে যদি বন্ড মার্কেট দাঁড়ায়।