নগদবিহীন লেনদেনে ঝুঁকছেন গ্রাহক

37

করোনাভাইরাস মহামারিতে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমগুলো বর্তমানে গেম চেঞ্জার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার-ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার থেকে শুরু করে মুদি আইটেম কেনা কিংবা ইউটিলিটি বিল প্রদান সব ক্ষেত্রেই কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ব্যাংকারদের মতে, ইন্টারনেট ও অ্যাপ-ভিত্তিক ব্যাংকিং অন্যান্য ডিজিটাল সিস্টেমের চেয়ে দ্রম্নত গতি অর্জন করছে। এই সাফল্য অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে এমন অ্যাপিস্নকেশন চালু করতে উৎসাহিত করেছে, যার মাধ্যমে কোনো গ্রাহক কেবল একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করে লেনদেন করতে পারেন।

দেশের পাঁচটি প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি সিটি ব্যাংক। সাত বছর আগে তারা ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপস চালু করেছিল। বর্তমানে প্রায় ২.২৫ লক্ষ গ্রাহক নিয়ে সিটি ব্যাংক এখন ইন্টারনেট ব্যাংকিয়ের শীর্ষস্থানীয় একটি নাম। কোভিড-১৯ শুরু হওয়ার আগে, ব্যাংকটি প্রতি মাসে তার ইন্টারনেট ব্যাংকিং চ্যানেলে গড়ে ৫৫০ কোটি টাকার লেনদেন করত। কিন্তু চলতি বছরের জুনে এই সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাতশ কোটি টাকা হয়েছে।

প্রাক-মহামারি সময়ের তুলনায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল), ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ-বাংলা এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ও জুনে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে উলেস্নখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

ইবিএল তার ব্যাকিং অ্যাপিস্নকেশনে গত তিন বছরে যে পরিমাণ ব্যবহার দেখেছে তার তুলনায় গত তিন মাসে ব্যবহারের হার বেড়েছে। এমটিবির অনলাইন লেনদেন জুনে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এপ্রিল ও মে’র পরিসংখ্যানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্রমবর্ধমান বিকাশের উচ্চ প্রবণতা প্রতিফলিত করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য দেখা যায়, এপ্রিল মাসে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রন্সফার বা ইএফটির মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ মার্চ থেকে ৮০.৪৩ শতাংশ বেড়ে ২৮,৪১১৭ কোটি টাকা হয়েছে।

কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে লকডাউন আরোপ করা সত্ত্বেও এপ্রিলে মার্চ থেকে নতুন ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ৭৭ হাজার ৬৬৪ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৯৮ লক্ষ হয়েছিল। ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা সামান্য বেড়েছে, যা প্রায় ১৬ লক্ষ।

কার্ড-ভিত্তিক ই-বাণিজ্য লেনদেন মার্চ মাসের ২২৪ কোটি টাকা থেকে এপ্রিল মাসে তা ২৫৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে প্রায় ৩৮,৬৩৩ জন নতুন গ্রাহক এপ্রিল মাসে ইন্টারনেট ব্যাংকিং পরিষেবা গ্রহণ করেছেন এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীদের মোট সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখে পৌঁছেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, মানুষের যাতে ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংকের শাখায় আসতে না হয় সেজন্য ব্যাংক প্রযুক্তিভিত্তিক কার্যক্রমগুলো আপগ্রেড করার চেষ্টা করছে। যদিও সাধারণ ছুটির কারণে ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ব্যাংকিং আংশিক চলছিল, তবে ডিজিটাল ব্যাংকিয়ের কার্যকারিতা এবং প্রতিক্রিয়া সত্যিই ভালো ছিল।

এপ্রিল এবং মে মাস লকডাউনে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এই সময়ে কার্ডের লেনদেন মার্চ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে। পয়েন্ট অফ সেলস (পিওএস) লেনদেনও এপ্রিল মাসে প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমে ৪৫৪ কোটি টাকায় নেমেছিল, যা এক মাস আগে ১,৪৩৮ কোটি টাকা ছিল।

ব্যাংকারদের মতে কার্ডের লেনদেন জুনে উলেস্নখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্ড বিভাগের প্রধান জানিয়েছেন, মে মাসের তুলনায় জুনে আমাদের কার্ডের ব্যবহার বেশি ছিল। তবে জুলাইয়ের অর্ধ মাসেই ইতোমধ্যে জুনে লেনদেন ছাড়িয়ে গেছে।

ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন বলেছেন, ই-বাণিজ্য লেনদেনে তাদের ব্যাংক মহামারির আগের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে প্রত্যাশা এর দ্বিগুণ ছিল।

শিরিন বলেন, কোভিড-১৯ এবং লকডাউনের কারণে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সংখ্যা নূ্যনতম ছিল। আর নতুন ডেবিট কার্ডের সংখ্যা নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে সম্পর্কিত না হওয়ায় খুব এটা উন্নতি হয়েছে তা বলা কঠিন।

সম্প্রতি ব্যাংকিংয়ের জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে প্রাইম ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাহেল আহমেদ বলেছিলেন যে পাশ্চাত্যের অবস্থার তুলনায় বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং এখনো শৈশবকালীন অবস্থায় রয়েছে।

আহমেদ আরও জানান, ডিজিটাল ব্যাংকিং গত কয়েক বছরের মধ্যে কাগজবিহীন, স্বাক্ষরহীন এবং এমনকি শাখাবিহীন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন সিস্টেমে বেশ বড় পরিবর্তন এনছে। বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং ডিজিটাল ব্যাংকিংকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে তিনি আশা করেন।

বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, প্রযুক্তি গ্রহণ ব্যাংকগুলোর পক্ষে ব্যয়বহুল হলেও এটি অপারেটিং ব্যয়ও হ্রাস করতে পারে। সব ব্যাংককে ডিজিটাল পরিষেবা গ্রহণ এবং উন্নত করতে হবে। যে ব্যাংকগুলো এটি করতে পারে না তারা পিছিয়ে পড়বে।

নিউজ: যায়যায়দিন